শ্রদ্ধাঞ্জলি: নীরদ চন্দ্র চৌধুরী

সাতকাহন ডেস্ক

খ্যাতিমানা বাঙালি লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরী ১৮৯৭ সালের ২৩ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থানার বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য সমালোচিত হন এ বরেণ্য লেখক।তিনি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে আর কলকাতায় পড়াশুনা করেন। তখনকার দিনের এফএ পরীক্ষায় পাশ করার জন্য তিনি কলকাতার রিপন কলেজে ভর্তি হন। ওই সময় রিপন কলেজে ভর্তি হন বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর তিনি ইতিহাস বিষয়ে পড়াশুনার জন্য ভর্তি হন কলকাতার বিখ্যাত স্কটিশ চার্চ কলেজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইতিহাস শাস্ত্রে স্নাতক পরীক্ষায় তখন তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। যে কারণে, তিনি তখন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর কালিদাস নাগের সাথে কলকাতার বিখ্যাত স্কটিশ চার্চ কলেজে অনুষ্ঠিত সেমিনারে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রিতে ভর্তি হলেও ফাইনাল পরীক্ষা দেন নি।

নীরদ সি. চৌধুরী'র কর্মমজীবন শুরু হয় ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিসাবরক্ষণ অধিদপ্তরের একজন সামান্য কেরাণি হিসেবে। কেরাণি'র চাকরির পাশাপাশি তখন তিনি বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রবন্ধ লিখতেন। তখনকার জনপ্রিয় সাময়িকীগুলোতে তিনি তখন নিবন্ধ পাঠাতেন। এভাবে নিবন্ধ লেখার মাধ্যমেই তিনি লেখার জগতে প্রবেশ করেন। অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত বাঙালি কবি ভারত চন্দ্রের উপর তিনি ইংরেজিতে একটি নিবন্ধ লিখলেন। সেটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত তখনকার বিখ্যাত ইংরেজি ম্যাগাজিন 'মডার্ণ রিভিউ'-তে ছাপা হল। এরপর তিনি সেনাবাহিনীর হিসাবরক্ষণ অধিদপ্তরের কেরাণির চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি সাংবাদিকতা এবং সম্পাদক হিসেবে নতুন কর্মজীবন শুরু করেন।

কলকাতার কলেজ স্কয়ারের নিকট মির্জাপুর স্ট্রিটের এক বাসায় তখন নীরোদ সি. চৌধুরী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার একত্রে বসবাস করতেন। ওই সময়ে তিনি তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজি ও বাংলা সাময়িকী যেমন 'মডার্ণ রিভিউ', 'প্রবাসী' ও 'শনিবারের চিঠি'তে সম্পাদনা করার সুযোগ পান। তখন তিনি 'সমসাময়িক' ও 'নতুন পত্রিকা' নামে দুটি সাহিত্যের কাগজ বের করা শুরু করলেন। যদিও পত্রিকা দুটি বেশিদিন প্রকাশ পায়নি। কিন্তু পত্রিকা দুটি'র সাহিত্য মান ছিল ভারী উচ্চস্তরের। ১৯৩২ সালে জনপ্রিয় লেখিকা অমীয়া ধরকে বিয়ে করেন নীরোদ সি. চৌধুরী। নীরোদ-অমীয়া'র তিন ছেলে।

১৯৩৮ সালে সংসার সংগ্রামের কারণে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা শরৎ চন্দ্র বসু'র একান্ত সচিব হিসেবে নীরোদ সি. চৌধুরী আবার চাকরি শুরু করেন। যে কারণে, তিনি ভারতের প্রখ্যাত সব রাজনীতিবিদ যেমন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু সহ অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শ যাবার সুযোগ পান। পাশপাশি তিনি কলকাতার বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায়, সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। আর অল ইন্ডিয়া রেডিও'র কলকাতা শাখায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৪১ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও'র দিল্লী শাখায় চলে যান। এ সময় আরেক বিখ্যাত লেখক ও সম্পাদক খুশবন্ত সিংয়ের সাথে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়।

১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয় নীরোদ সি. চৌধুরীর প্রথম বই 'দি অটোবায়োগ্রাফী অব অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান'। প্রথম বই দিয়েই তিনি সেরা ভারতীয় ইংরেজি লেখকের তালিকায় চলে আসেন। প্রথম বইয়ে তিনি নতুন ও স্বাধীন দেশ হিসেবে ভারতের বিচার ব্যবস্থাকে ভারী কটাক্ষ করেন এবং বইটির উৎসর্গপত্রে তিনি লেখেন- ''To the memory of the British Empire in India, Which conferred subjecthood upon us, But withheld citizenship. To which yet every one of us threw out the challenge:

"Civis Britannicus sum". Because all that was good and living within us, Was made, shaped and quickened By the same British rule.''

এর ফলে নীরদ সি. চৌধুরী সরকারী চাকরি থেকে বহিস্কৃত হন এবং অবসর ভাতা থেকেও বঞ্চিত হন। এছাড়া তিনি ভারতে কালো তালিকাভূক্ত লেখক হিসেবে চিহ্নিত হন। ফলে পরবর্তী সময়ে তিনি জোরপূর্বক নতুন জীবনে গমন করতে অনেকটা বাধ্য হন। ভারত সরকার জানায়, তিনি ভারত সরকার নিয়ন্ত্রিত অল ইন্ডিয়া রেডিও'র রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে আইনের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন, যা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও বিবিসি যৌথভাবে নীরদ চন্দ্র চৌধুরীকে ৮ সপ্তাহের জন্য ইংল্যান্ড সফরের আমন্ত্রণ জানায়। বিবিসিতে তিনি বক্তৃতা করেন। ওই সময় ব্রিটিশ জীবনধারার উপর তিনি আটটি বক্তৃতা দেন। যা পরে একত্রিত করে 'প্যাসেজ টু ইংল্যান্ড' নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। ই.এম.ফরস্টার এর উপর তাঁর সমালোচনা-ভাষ্য ও তাঁর দৃষ্টিভংগী শীর্ষক রচনা 'দ্য টাইমস্ লিটারেরি সাপ্লিমেন্টে' তখন প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ সালে তাঁর লেখা 'দ্য কন্টিনেন্ট অব সার্স' বইটি প্রথম ও একমাত্র ভারতীয় হিসেবে 'ডাফ কুপার প্রাইজ' পায়। ১৯৭২ সালে মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকশনের ব্যানারে 'এডভেঞ্চার অব এ ব্রাউন ম্যান ইন সার্চ অব সিভিলাইজেশন' নামে যে ডকুমেন্টারি ফিল্ম নির্মাণ করা হয়, তার উপজীব্য স্বয়ং নীরদ চন্দ্র চৌধুরী।

১৯৮৮ সালে তিনি 'দাই হ্যান্ড, গ্রেট আনার্ক' নামে নিজের জীবনের শেষভাগ নিয়ে আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। ১৯৯২ সালে তিনি ব্রিটেনের রাণী ২য় এলিজাবেথ কর্তৃক সম্মানিত হন এবং 'অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার' উপাধীতে ভূষিত হন। ১৯৯৭ সালে তিনি নিজের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে সর্বশেষ বই 'থ্রী হর্সম্যান অব দ্য নিউ এপোক্যালিপস' প্রকাশ করেন।

১৯৯৪ তাঁর স্ত্রী অমীয়া চৌধুরী অক্সফোর্ডে মারা যান। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডেই নিজের ১০২তম জন্মদিনের মাত্র কয়েক মাস আগে ১লা আগস্ট নীরোদ সি. চৌধুরী পরলোক গমন করেন।

নীরোদ সি. চৌধুরী'র গ্রন্থসমূহ:

১. The Autobiography of an Unknown Indian (1951), ২. A Passage to England (1959), ৩. The Continent of Circe (1965), ৪. The Intellectual in India (1967), ৫. To Live or Not to Live (1971), ৬. Scholar Extraordinary, The Life of Professor the Right Honourable Friedrich Max Muller, P.C. (1974), ৭. Culture in the Vanity Bag (1976), ৮. Clive of India (1975), ৯. Hinduism: A Religion to Live by (1979), ১০. Thy Hand, Great Anarch! (1987), ১১. Three Horsemen of the New Apocalypse (1997), ১২. The East is East and West is West (collection of pre-published essays), ১৩. From the Archives of a Centenarian (collection of pre-published essays), ১৪. Why I Mourn for England (collection of pre-published essays), ১৫. বাঙালি জীবনে রমণী, ১৬. আত্মঘাতী বাঙালি, ১৭. আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ, ১৮. আমার দেবোত্তর সম্পত্তি, ১৯. নির্বাচিত প্রবন্ধ, ২০. আজি হতে শতবর্ষ আগে (আত্মজীবনী), ২১. আমার দেশ আমার শতক।

নীরোদ সি. চৌধুরী'র পুরষ্কারসমূহ:

১. ১৯৬৬ সালে দ্য কন্টিনেন্ট অব সার্স (১৯৬৫) রচনার জন্য ডাফ কুপার মেমোরিয়াল পুরস্কার, ২. ১৯৭৫ সালে আনন্দ পুরস্কার ও ভারত সরকার প্রদত্ত সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার, ৩. ১৯৯০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি.লিট বা ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি, ৪. ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডের রাণী ২য় এলিজাবেথ কর্তৃক সিবিই বা কমান্ডার অব অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার উপাধি, ৫. ১৯৯৬ সালে বিশ্ব-ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ডিগ্রী দেশিকোত্তম।

নীরদচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র তাঁর সমুদয় পুস্তক ও চিত্রকর্ম ক্যালকাটা ক্লাবকে দান করেন। ক্লাব উক্ত দ্রব্যাদি দিয়ে ‘নীরদ চৌধুরী কর্নার’ স্থাপনের মাধ্যমে তাঁর প্রতি মরণোত্তর সম্মান প্রদর্শন করে।

(কৃজ্ঞতা: Quiz vlm ও newsg24.com)